ফাইপির পথে

ভোর হতে এখনো অনেক দেরী। বাইরে ধুম বৃষ্টি হচ্ছে। থেমে থেমে পিলে চমকে উঠার মত বাজ আছড়ে পরছে এদিক ওদিক। তার সাথে বইছে বাতাসের তান্ডব। এমন দুর্যোগপূর্ণ রাতে ঘুমানোর কথা চিন্তাও করা যায় না। জুলাই মাসের পাহাড়ে মাঘের শীত নেমে এসেছে। বেড়ার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ঠেলে ঠুলে আসা তীক্ষ্ণ ঠান্ডা বাতাস গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। আমি আর মাইনুল ভাই রামথন দাদার রান্না ঘরে চুলার কোনায় বসে প্রকৃতির এই বিষম রুপ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি।

দাদার রান্নাঘরটা বেশ বড়। পুরো বাসাটি বিরাট কয়েকটি গাছের গুঁড়ির উপর বানানো। কাঠের থাম গুলোতে আলকাতরা লাগানোর প্রয়োজন হয়নি, লাকড়ির ঝুল-কালিতেই তৈলাক্ত হয়ে প্রাকৃতিকভাবেই বার্নিশ হয়ে আছে। ঘরের পূর্ব দিকের বাঁশের তৈরি তাকে শয়ে শয়ে সেভেন-আপের বোতলে পানি সংরক্ষণ করে রাখা। ট্যাপ খুললেই তো আর এখানে ঘরে বসেই পানি পাওয়া যায় না। এত দূরের ঝিরি থেকে প্রতিদিন পানি নিয়ে আসা সত্যি খুব কষ্টকর।

ঘরের আরেকদিকে রান্নার হাড়ি-পাতিলের তাক। আর পশ্চিম কোনে মাটির প্ল্যাটফর্মের উপর লাকড়ির চুলা জ্বলছে। চুলার ঠিক উপরেই ছোট ছোট সাপ আর শুকরের মাংস আর চর্বির শুটকি শুকানোর জন্য রাখা। চুলায় এক টুকরো লাকড়ি দিয়ে আগুন টাকে আরেকটু উসকে দিতেই দেখি গায়ে চাদর জড়িয়ে রামথন দা ঘরে ঢুকছে।

রামথন দা কে দেখলেই মনে হয় মাইকেল এঞ্জেলোর খোদাই করা কোন নীরেট পাথরের গ্রীক বীর। চওড়া বুক, পেটে ছয় ভাঁজ, রোদে পুড়ে যাওয়া তামাটে শরীর। আরাকানী চেহারায় ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ ভর্তি সাহস। এই রামথন দা’র বয়স পঞ্চাষোর্ধ বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয়। ২০০৯ সালে প্রথম যেবার ‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জলপ্রপাতের খোঁজে’ এখানে আসি তখনই তাঁর সাথে আমার পরিচয়। তখন থেকেই আমার কাছে এক বিষ্ময়ের নাম রামথন বম। থাইক্ষ্যং আসলেই অজানা সব অরণ্য পাহাড়ে তাঁর রোমাঞ্চকর সব শিকার কাহিনী, ঝর্ণা বেয়ে নামা, পাইথন শিকারের জন্য গুহায় ঢুকার অভিজ্ঞতা মন্ত্র-মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি। তাঁর ঘরে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন শিকারের ট্রফিগুলো দেখে রোমাঞ্চিত হই। পাহাড়ে কোথায় কোন প্রপাত আছে, কথায় কোন গুহা আছে সব তাঁর নখদপর্নে। এবারও তাঁর কাছে এক লুকিয়ে থাকা জলপ্রপাতের খোঁজে এসেছি।

‘আগামীকাল কী তোমরা ফাইপির দিকেই যাবা?’ চুলার আগুনে হাতে পাকানো সিগারেটটি ধরিয়ে রামথন দা জিজ্ঞেস করল।

মাইনুল ভাই বলল- হ্যাঁ দাদা। কালকেই বের হয়ে যাব। আজকে যেই বৃষ্টি পরলো, ঝিরিতে কালকে অনেক পানি পাব। এটা মিস করতে চাই না।

রাস্তা এখন একটু ভালো পাবা। পাড়ার জুম এবার ঐ পাহাড়ের ঢালের আগ পর্যন্তই কাটা হয়েছে। ঝোঁপ-ঝাঁড় কেটে একদম পরিস্কার করা রাস্তা।

“রাস্তা তো রাস্তাই দাদা। রাস্তার আবার ভালো-খারাপ কি?”, মাইনুল ভাই বলল।

আমার শরীর ভালো থাকলে তোমাদের সাথে যেতাম। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয় না। একসময় রোজ শিকারে যেতাম। এখন আর পাহাড়ে শিকারও পাওয়া যায় না, তাই কোথাও যাওয়াও হয় না।

তোমার যাওয়া লাগবে না দাদা, তুমি শুধু একটা ম্যাপ একে দাও। সালেহীন ডায়েরী আর কলমটা নিয়ে আসো, দাদা ম্যাপ এঁকে দিক।

খানিকটা গাঁইগুঁই করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক কষ্টে আগুনের পাশ থেকে উঠে পাশের ঘর থেকে ডায়েরী আর কলম নিয়ে দাদার পাশে বসে পড়লাম।

আচ্ছা দাদা জায়গাটার নাম ফাইপি হল কেন? আগুনে জমে যাওয়া হাতের তালু সেঁকতে সেঁকতে আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ফাইপি অর্থ আমাদের বোম ভাষায় হাতির বাধা। মানে যে রাস্তায় হাতি চলতে পারে না। অনেকদিন আগে ঐ পাহাড়ের খাঁজে আমরা একটা হাতি শিকার করেছিলাম। গভীর মনোযোগ দিয়ে ম্যাপ আঁকতে আঁকতেই জবাব দিল রামথন দা।

বলেন কি দাদা? হাতি? শিকারের গন্ধে আমি নড়েচড়ে বসলাম।

হ্যাঁ। যুদ্ধের ঠিক পর পর। একটা মদ্দা হাতি দলছুট হয়ে কিভাবে যেন এদিকে চলে আসে। বিরাট কালো দৈত্যের মত হাতিটা জুমের পাহাড় সব তছনছ করে দিচ্ছিলো। আমার জুমের সব ভুট্টা একরাতেই শেষ করে দিয়েছিল। পুরো তিন রাত তিন দিন লেগেছিল শিকার করতে।

কি দিয়ে শিকার করলেন দাদা?

দাঁড়ান দাদা, গল্প একটু পরে শুরু করেন। আগে একটু চা বসাই। চা আর চুরুট ছাড়া শিকারের গল্প জমে না, সোৎসাহে চুলায় চা বসিয়ে দিল মাইনুল ভাই। 

কড়া লিকারে চুমুক দিয়ে বললাম, এইবার বল দাদা–কিভাবে শিকার করলেন?

ছোট ছোট টুকরো করে কাটা খবরের কাগজ দিয়ে বানানো রোলিং পেপারে তামাক গুঁজতে গুঁজতে রামথন দাদা শুরু করল তাঁর হাতি শিকারের কাহিনী-

বর্ষা তখনও শেষ হয় নাই। সেপ্টেম্বর মাস ছিল বোধ হয়। হঠাৎ একদিন সকালে জুমে গিয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। জুমের সব ফসল মাটিতে মিশে গেছে। কোন ধান গাছ নাই। একটা ভুট্টা নাই। সব শেষ হয়ে গেছে।

গল্প বলতে বলতে রামথন দাদা যেন অতীতে ফিরে গেলেন। প্রচণ্ড ক্রোধেই বুঝি তাঁর চোখ দুটো চকচক করছে। আর ক্রোধ হবেই না বা কেন? কত অমানুষিক পরিশ্রম করে তাঁরা জুমের পাহাড় কেটে পরিস্কার করে,  বীজ বোনে, ফসল ফলায়। পুরো বছরের ভাত তাঁদের এই পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে। অনা-বৃষ্টি, অধিক বৃষ্টি, বন্য শুকর, ভাল্লুক, বুনো হাতি, ইঁদুর বন্যা–যে কারণেই ফসল নষ্ট হোক না কেন এর ভুক্তভোগী তো তাঁদেরকেই হতে হয়।  ভাতের অভাব কি জিনিস, দুর্ভিক্ষ কি জিনিস সেটা বলে বুঝানো যাবে না। সেই পরিস্থিতিতে নিজে না পড়লে কেউ বুঝবেও না। এইসব প্রতিকূলতার সাথে এখনো তাঁদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয়। জীবনের এই সংগ্রামী কঠোরতাই তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছে।

পায়ের ছাপ দেখে বুঝলাম একটাই বুনো হাতি, কোন ভাবে দল ভেঙ্গে খাওয়ার লোভে এদিকে চলে এসেছে। পায়ের ছাপ দেখে কিন্তু চেনা যায় কোনটা শুকর, কোনটা হরিন, কোনটা ভাল্লুক। সেই রাতে গীর্জার সামনের মাঠে সবাইকে নিয়ে পাড়ার জরুরি মিটিং বসল। কারবারীকে বললাম, হাতিটা খাবারের দেখা পেয়ে গেছে। তাড়ালেও ঐটা বারবার আসবে। যেভাবেই হোক হাতিটাকে মারতেই হবে। আর কেউ না হোক আমি একা হলেও ঐটার শিকার করতাম। 

ঐ রাতেই পাড়ার সব জোয়ান গাদা বন্দুক আর বল্লম নিয়ে হাতির খোঁজে বের হয়ে গেলাম। তিন রাত তিন দিন কেউ ঘুমাতে পারি নাই। সারারাত জেগে পাহারায় ছিলাম সব জুম পাহাড়ে। পরদিন মাঝরাতে হাতিটাকে দেখতে পাই। বিশাল শরীর, ছোট ছোট চোখ। মশাল জ্বালিয়ে সাথে সাথে সবাই হাতিটাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলি। আগেই পরিকল্পনা করেছিলাম, হাতিটাকে তাড়িয়ে প্রাংশায় নামিয়ে আনব আর যেই পাহাড়ের খাঁজে কালকে তোমরা যাবা সেখানে হাতিটাকে আঁটকে ফেলব। ঐ খাঁজটা আমার আগেই দেখা ছিল। ঐখানে অনেক আগে শিকার করতে যেতাম। ওখানে অনেক উল্লুক আর পাখি পাওয়া যেত। খাঁজের উপরের পাহাড়ে অনেক বিশাল বিশাল পাথর ছিল। আমরা কয়েকজন পাহাড়ের উপরে চলে গেলাম। বাকীরা মশাল জ্বালিয়ে হাতিটাকে ধাওয়া দিয়ে পাহাড়ের খাঁজে নিয়ে আসলাম। ব্যাস, খাঁজের ভিতর আটকা পরে গেল। হাতির সামনে ছিল খাড়া জলপ্রপাত আর পিছনে মশাল হাতে পাড়ার লোক।

হাতি খাঁজের ভিতর যেই ঢুকলো উপর থেকে বিশাল পাথরগুলো বাকিরা গড়িয়ে নীচে ফেলে দিল। এভাবেই হাতিকে খাঁজে আটকে ফেললাম। বিশাল পাথরগুলো ডিঙ্গিয়ে পিছনে আর যাওয়ার রাস্তা ছিল না। তারপর কাজ সহজ হয়ে গেল। বন্দুক দিয়ে গুলি করে আর বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলি। কালকে গেলে দেখতে পাবা বিশাল বিশাল পাথর একটার উপর একটা ঝিরিতে পরে আছে।

শিকার করা হাতিটা কি করলেন পরে দাদা? আমি আর বিস্ময় চেপে রাখতে পারলাম না।

কেটে কেটে পাড়ায় নিয়ে আসলাম। বড় শিকার পেলে সারারাত নাচ-গান আর প্রার্থনা সঙ্গীত গেয়ে উৎসব করি আমরা। হাতির মাংস খেতে স্বাদ নাই। কেমন যেন রাবারের মত ছাবড়া ছাবড়া। বিস্বাদ মাংসের স্মৃতি মনে পরে যাওয়ায় রামথন দা’র মুখ বেঁকে গেল।

প্রথম প্রথম এসব শুনে গা কেমন যেন গুলিয়ে উঠত। কিন্তু এখন আর তেমন হয় না। পাহাড়ি  এই বুনো পরিবেশের সাথে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছি। মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনে গেলাম। নিজের স্বত্তা হারিয়ে গেল প্রাচীন এক শিকারী দলের মাঝে। কেন যেন খৃষ্টের জন্মের দশ হাজার বছর আগের ম্যামথ শিকারের ছবি ভেসে উঠল কল্পনায়।
শিকারের গল্পের সাথে সাথে রামথন দা’র ম্যাপ আঁকাও শেষ হয়ে গেল। আমি আর মাইনুল ভাই ভালো ভাবে রাস্তা আর আশে-পাশের পাহাড় সম্পর্কে ধারনা নিয়ে নিলাম।

আমি ঘুমাতে গেলাম, তোমরাও এখন শুয়ে পড়। অনেক রাত হয়ে গেছে। এই বয়সে আর বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারিনা বলেই দাদা ঘুমাতে চলে গেল।

আর এক রাউন্ড চা শেষ করে আমরাও উঠে পড়লাম। পাশের ঘরের মেঝেতে বেশ কয়েকটা চাদর মেতে বিছানা করে নিলাম দুজন। এটা তাঁদের বসার ঘর। পাশেই দুটি ছোট ছোট ঘরে রামথন দাদা আর তাঁর ছেলে পরিবার নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি করে শুয়ে পড়লাম। তখন চোখে ছিল হাতি শিকারের ছবি। কল্পনায় ভেসে উঠল শিকারের সময় হাতিটির বুকফাটা বিদীর্ন চিৎকার আর আর বেঁচে থাকার জন্য তীব্র আস্ফালন। বাহিরে তখনো চলছিল আকাশের একটানা আর্তনাদ।

ঘরের নীচে শুকর-মুরগীর চেঁচামেচি আর ঘরের ভিতর পিচ্চিপাচ্চাদের হাউকাউ শুনে যখন ঘুম ভাঙলো তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। জিপিএস বের করে দেখলাম সকাল আটটা বাজে। ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। মাইনুল ভাইও দেখলাম উঠে চাদর ভাঁজ করছে। ঘুম মাখা চোখে চাদর ভাঁজ করতেই গরম ধোঁয়া ওঠা চা এসে গেল।

চা শেষ করেই একটা ঝোলা ব্যাগে দুই প্যাকেট নুডলস, একটা হাড়ি, ছুরি আর পানির বোতল নিয়ে পথের জন্য তৈরী হয়ে গেলাম। রামথন দা’র ঘরেই আমাদের ব্যাকপ্যাক দুটো রেখে যাব। গত রাতেই পরিকল্পনা করেছিলাম ফাইপি দেখে আবার আগামীকালই থাইক্ষ্যং ফিরে আসব। তাই এত ভারী দুটো বোঝা কাঁধে নিয়ে ট্রেক করার কোন মানেই হয় না।

ভোরেই বাসার সবাই জুমে কাজ করতে চলে গেছে। রওনা দেবার সময় দাদার সাথে আর দেখা হয় নি। ঘর থেকে বেড়িয়ে যখন ট্রেক শুরু করি তখন নয়টা বেজে গেছে। একদম পরিষ্কার আকাশ। গতরাতের তান্ডের চিহ্নমাত্র নেই। শুধু ভেজা ভেজা ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে সূর্যের আলো লেগে বেশ আরাম লাগছে। এমন আবহাওয়ায় সারাদিন কোন রকম ক্লান্তি ছাড়াই ট্রেক করা যায়। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। রাতের বৃষ্টি পরিবেশকে আরও সজীব করে গেছে। 

গাছের পাতাগুলোর ক্লোরোফিলে সূর্যালোক পরে চিকচিক করছে। বিরাট পাড়া থাইক্ষ্যং। এর উত্তরে কেওক্রাডাং, পূর্বে মদক, পশ্চিমে আছে মিজো গেরিলাদের হাইড আউট হিসেবে খ্যাত ‘ক্যাপিটল’ আর দক্ষিণে তাজিংডং। পাসিং পাড়া থেকে গাড়ীর পাহাড় কেটে বানান মাটির কাঁচা রাস্তাটি কেওক্রাডংয়ের নিচ দিয়ে থাইক্ষ্যং পর্যন্ত এসে গেছে। গরমের সময়টুকুই এই পথে চান্দের গাড়ী মালামাল নিয়ে আসতে পারে।

কপিটালের নিচ দিয়ে থাইক্ষ্যং পাড়ায় প্রবেশ করার মুখে চোখে পরে পুরানো এক সমাধিক্ষেত্র। সামনেই একটা ভাঙা বাশেঁর বেঞ্চ। বেঞ্চের বা’পাশ দিয়ে চওড়া এটি রাস্তা চলে গেছে তামলো পাড়ার দিকে। প্রায় ষাট ঘর পরিবার বাস করে এই পাড়ায়। সবাই মূলত ব্যোম জাতিগোষ্ঠীর। পাহাড় কেটে মাটি সমান করে তাঁরা মাচার উপর বাঁশ, গাছের গুড়ি আর ছনের ছাউনি দিয়ে তাঁদের ঘর বাঁধে। চওড়া লাল মাটির রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মাচার ঘর। প্রতিটি ঘরের পাশেই ছোট করে বানানো লাকড়ি্র ঘর আর মুরগীর খোয়াড়। 

এই পাড়ার মত এত গরু অন্য কোন পাড়ায় আমার চোখে পড়েনি। সারাদিন তারাই রাস্তা দখল করে রাখে। শুকরের আধিক্যের কারনেই হয়ত পাড়াটা মোটামটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। খেয়াল করলাম শহুরে আধুনিকায়নের হালকা ছোঁয়া এদিকেও কিছুটা স্পর্শ করে গেছে। কয়েকটি ঘরে চকচকে টিনের চাল সেটাই প্রমাণ করে। পাড়ার প্রায় সব কটি ঘরের ছাউনিতে শোভা পাচ্ছে সোলার প্যানেল। উজ্জ্বল রোদের স্পর্শ পেয়ে ঝিলিক দিয়ে উঠছে সিলিকনের বর্গগুলো। সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ে এখন আর অন্ধকার ঝুপ করে নেমে আসে না। এনার্জী সেভিং বাল্বগুলো আলোকিত করে রাখে পাড়ার ঘরগুলো। একটা দোকান ঘরে ল্যাপটপও দেখলাম এইবার। সন্ধ্যা নামলেই পাড়ার লোকজন ল্যাপটপে সিনেমা-নাটক দেখে সময় পার করে। দেখে মনে হয় প্রযুক্তি এখানে অযথাই অনুপ্রবেশ করছে। 

মন্তব্যটা বিতর্কিত হয়ে গেল মনে হয়। এটাও হয়ত আমাদের এক ভন্ডামী। কিন্তু আধুনিকতার লেবাস পরে স্বীয় জাতিস্বত্তাকে বিসর্জন দিয়ে দেয়াটা আমি অন্তত মেনে নিতে পারছিলাম না। রামথন দা’কে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দাদা সবাই তো সোলার লাগায় ফেললো, তুমি কবে লাগাবা?’ তাঁর কথায়, তাঁর বাপ দাদা যেভাবে থাকতেন তিনিও ঠিক সেভাবেই থাকতে চান। এগুলো জীবনকে নাকি অহেতুক জটিল করে ফেলে। অতিরিক্ত চিন্তায় মাথা ব্যাথা করে। প্রতি মাসে মাসে কিস্তির টাকা জোগাড় কর, বছর বছর ব্যাটারী পাল্টাও, পানি পাল্টাও… ধুর ধুর, শুধু শুধু সময় নষ্ট। 

এই একবিংশ শতাব্দীতেও এখনো তাই তাঁর ঘরে প্রাচীন কুপি বাত্তি জ্বলে। তাঁর ঘর শহরের মত আলোকিত থাকে না বলেই হয় এখানে থাকতে আমি এত আরামবোধ করি। কে জানে এর কারণ কী? – এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে পাড়ার সব ঘর ছাড়িয়ে সদ্য তৈরী করা গীর্জার সামনে চলে আসলাম। গীর্জার পাশ দিয়ে ঠিক উত্তরে সুনসাং পাড়ার রাস্তা চলে গেছে। পাশ দিয়ে আর একটি রাস্তা পূর্বে থিনদ্যোলতে পাড়ার দিকে চলে গেছে, ম্যাপ ধরে ধরে আমরা ডানের সেই রাস্তায় নেমে গেলাম। 

পনের বিশ মিনিট  হাঁটতেই আমরা পাড়ার সীমানা পাচিল টপকে পাড়ার জুম পাহাড়ে চড়াই শুরু করলাম। রাস্তা ক্রমেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এটেল মাটি বৃষ্টির পানি পেয়ে প্রচুর পিচ্ছিল হয়ে আছে। পায়ের স্যান্ডেল একটু পর পর পিছলে যাওয়ায়  ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি। কি কাঁদা আর কি পিচ্ছিল, মাইনুল ভাই দেখি তরতর করে পাহাড় বেয়ে উঠে যাচ্ছে। সূর্যের তেজ বাড়ার সাথে সাথে আরামদায়ক ভাবটুকুও মিলিয়ে গেল। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। সামনের একটা চড়াই উঠেই প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে একদম থতমত খেয়ে গেলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু ঢেউ খেলানো জুমের পাহাড়। যে জমির ধান কাটা হয়ে গেছে সেগুলো বাদামী হয়ে আছে। বাকি সব সবুজ। সবুজের এত বাহারি কন্ট্রাস্ট ভয়ংকর সুন্দর। দূরের মদক রেঞ্জের পাহাড়গুলো অহংকারীর মত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। 

জুমের রাস্তা দিয়ে আমরা আরো এগিয়ে গেলাম। রাস্তার দু’পাশেই সারি সারি জুম ঘর। আরো ঘন্টা খানিক ট্রেক করে শেষ জুম ঘরটিও পার হয়ে গেলাম। রাস্তা এখন ক্রমশ নীচের দিকে নামছে। এবার রাস্তা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গেল। একটা পুরানো জুমের রাস্তা নীচে নেমে গেছে। ম্যাপ অনুযায়ী এভাবে নীচে নেমে গেলে আমরা রেমাক্রি-প্রাংশায়  নেমে যাব। এতক্ষণ কোন জোঁকের দেখা পাইনি কিন্তু এই জঙ্গলের রাস্তায় এখন আর মাফ নাই। পা থেকে জোঁক সরাতে সরাতে নীচে নামতে শুরু করলাম। মাঝে মাঝেই পাহাড় একদম নব্বই ডিগ্রি খাড়া হয়ে নেমে গেছে। গাছের শিকড় আর ডাল ধরে নীচে নামছি। আবাক করার বিষয় হল, যখনই নামার জন্য কোন সাপোর্ট দরকার হবে, ঠিক সেই জায়গাটাতেই কেন যেন কাঁটা গাছ থাকবেই। এটা পরীক্ষিত সত্য। এবারও এর অন্যথা হল না। 

কিছুক্ষণ নামতেই শ্বাস ঘন হয়ে গেল। কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম বেয়ে পড়ছে। পাহাড় বেয়ে নামার সময় হাঁটুর উপর অনেক চাপ পড়ছিল। এমন সময় গুলোতে মনে হয়, ধুর ছাই কেন যে আসলাম। পাড়াতেই বসে থাকতাম, বই টই পড়ে আচ্ছামত ঘুমানো যেত। কিন্তু পরক্ষণেই যখন নীচে ঝিরির আওয়াজ কানে আসে কষ্ট আর ক্লান্তি বেমালুম ভুলে যাই। নতুন উদ্যোমে আবার পা দুটো চলতে থাকে। এই এত কষ্ট আর ঘাম ঝরানোর বিনিময়ে পুরষ্কার হিসেবে পাওয়া গেল রেমাক্রি প্রাংশা। হিম শীতল রেমাক্রির বুকে দুই পা রেখে এক আজলা পানি মুখে ছিটিয়ে দিতে পেরে মনে হল আমি কত ভাগ্যবান- মুহুর্তটুকুর জন্য, কষ্টের পর এই সীমাহীন আনন্দটুকুর জন্য। 

দেড় হাজার ফিট নামতে আমাদের প্রায় আধা ঘণ্টা লেগে গেল, কিন্তু নামার সময় মনে হচ্ছিলো যেন যুগ যুগ ধরে নামছি। ইতোমধ্যেই আমাদের দুই পা রক্তে ভেসে গেছে। কিন্তু সব ক্লান্তি ভুলে গেলাম রেমাক্রি প্রাংশার রূপ দেখে। এই সেই প্রাংশা-রামাক্রি। নির্মল পানির স্রোত পাথুরে বোল্ডারে বাধা পেয়ে চোখের সামনেই রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। ছোট বড় পাথরের সাথে সংঘাতে গর্জন করছে বিপুল পানির স্রোত। প্রাংশার পাড়ে ছোট একটা চা বিরতি নিলাম। খড়-কুটো জোগাড় করে মুহুর্তের মধ্যেই আগুন জ্বালিয়ে ফেলল মাইনুল ভাই।

চায়ে চুমুক দিতেই আবার চাঙ্গা হয়ে গেলাম। প্রাংশা ধরে দক্ষিণে হাঁটা শুরু করলাম। প্রায় এক কিলোমিটার পর পশ্চিম দিক থেকে একটি ঝিড়ি মুখ প্রাংশায় এসে মিশেছে। এটাই ফাইপি ঝিড়ি। এখন এই ঝিড়ি ধরেই আমরা আবার উপরে উঠে যাব। এই সেই পাহাড়ের খাঁজ যেখানে রামথন দাদারা হাতি শিকার করেছিল। আমাদের ম্যাপ রিডিং আর গল্প যদি ঠিক থাকে তাহলে এই খাঁজের শেষ মাথায় চমৎকার  একটি জলপ্রপাত পাওয়া যাবে। 

ভয়ানক ঝোঁপঝাড় পেড়িয়ে ফাইপি ঝিড়ির কিছুটা উপরে উঠতেই দেখা পেলাম সেই বিশাল আকারের পাথরগুলোর। হাতিটির পথ আটকানোর জন্য যেগুলো পাহাড়ের উপর থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল। আসলেই বিশাল বিশাল পাথর। একটার উপর একটা পরে আছে। এত সময়ের পর পাথর গুলোর উপর শ্যাওলা জন্মে গেছে। হাতি তো পরের কথা খর্বকায় মানুষ হয়ে শ্যাওলা ধরা এই পিচ্ছিল বিশাল পাথরের পাঁচিল কিভাবে পার হব সেই চিন্তাতেই আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। মাইনুল ভাইকে দেখি তরতর করে পাথর বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। কি যে লাগানো আছে উনার পায়ে কে জানে। চুম্বকের মত উনার পা পাথরের দেয়ালে আঁটকে যায়। মাঝে মাঝে উনাকে আমার স্পাইডার ম্যান মনে হয়। 

উনি পারলে আমি পারব না কেন? জিদ চেপে গেল মাথায়। আমিও সামনে পিছে চিন্তা না করে উনার পিছন পিছন উঠে যেতে লাগলাম। কিছু কিছু জায়গায় দুই পাথরের সংকীর্ন চিপা দিয়ে শরীর গলিয়ে সামনে এগুতে হচ্ছে। পাথরের নীচে মাথা ঢুকানোর সময় ভয়ভয় লাগে। যদি মাথা ভর্তা হয়ে যায়? একসময় পাথরের বাঁধা পার করে জলপ্রপাতের ঠিক সামনে পৌঁছে গেলাম। ছোট্ট কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর একটি জলপ্রপাত। ঠিক নীচে একটা বিশাল পাথরের দিকেই সবার আগে চোখ চলে যায়। ডুবন্ত জাহাজে আকৃতির পাথরটি টাইটানিকের কথা মনে করিয়ে দেয়। 

আকারে ছোট হলে কি হবে এই ফাইপি জলপ্রপাত  প্রাংশা-রামাক্রির একটি অন্যতম প্রমিনেন্ট সোর্স। ঘন জঙল পাহাড়ের খাঁজটাকে যেন চারপাশ থেকে চেপে রেখেছে। নাম না জানা পাখিদের কিচিরমিচির, ঝিঁঝি পোকার প্রণয়সঙ্গীকে খোঁজার জন্য বাঁশির মত তীক্ষ্ণ আওয়াজের সাথে পাথরের দেয়ালে পানির অবিরাম আঁছড়ে পড়ার আওয়াজ জায়গাটাকে রহস্যময় করে রেখেছে। চিনে জোঁক কামড়ানোর ব্যাথা আর শরীর জুড়ে ক্লান্তি দূর করতে তৃষ্ণার্থের মত আমরা ফাইপির সৌন্দর্য পান করতে লাগলাম।

হুস ফিরতে দেখি সন্ধ্যা নামতে আর দেরী নেই।   ফাইপির ঠিক পাশ দিয়েই একটি ফাটল উপরের পাহাড়ে উঠে গেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম এই ফাটল দিয়েই উপরের পাহাড়ে উঠে যাব। এই পাহাড়ের উত্তরেই শেষ জুম ঘরটা আছে। রাস্তা খুঁজে পেতে খুব একটা সমস্যা হবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। ফাটল ধরে আমরা দুজন পাহাড়ের উপরে উঠে গেলাম। বুনো লতা আর কাঁটা ঝোঁপের জঙল ভেদ করে, শত শত জোঁকের কামড় খেয়ে আমরা উত্তরদিক বরারবর হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠতে শুরু করলাম। চূড়ায় দম নিতে থামতেই দেখি সামনে মদক রেঞ্জের এক অদ্ভূত দৃশ্য। ঘন কালো মেঘ পুরো পূব আকাশ ঢেকে ফেলেছে। মদকের চূড়াগুলো ধীরে ধীরে গিলে ফেলছে দৈত্যাকার মেঘগুলো। 

চারিদিকে কেমন ভ্যাপসা গুমোট ভাব। হাজার হাজার পাখি আর উল্লুকের আর্ত চিৎকারে পরিবেশ কেমন যেন ভীতিকর হয়ে গেল। যে কোন সময় অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। বৃষ্টির মধ্যে এই রাস্তায় হাঁটতে কেমন মজা হবে কল্পনা করতেই বুঝি আমাদের হাঁটার গতি দ্বিগুন হয়ে গেল! জিপিএসে শেষ জুম ঘরটা মার্ক করা ছিল বলে রাস্তা খুঁজে পেতে তেমন সমস্যা হল না। বৃষ্টি আসার আগেই আমরা জুম ঘরে পৌঁছে গেলাম। আকাশ ইতোমধ্যেই কালো হয়ে গজরাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল প্রকৃতির তান্ডব।

আজকে রাতে এই জুম ঘরেই থেকে যাই, কি বল? কালকে একবারে শিলোপি ঝিড়িটা এক্সপ্লোর করে আসব। যা আছে কপালে। 

এই বৃষ্টিতে পাড়ায় ফেরার কোন মানেই হয় না। খুশি হয়ে আমি উত্তর দেই।

রাতের খাবার রান্না আর পান করার জন্য তাই মহা উৎসাহে রেইন কোট পরে কলা পাতা দিয়ে বৃষ্টির পানি জমানো শুরু করে দিলাম। ওদিকে মাইনুল ভাই লাকড়ি জ্বালিয়ে চুলায় চা বসিয়ে দিল। শরীরে কাঁপুনি তোলা এমন বৃষ্টির মধ্যে এক মগ গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিলে মনে হয় জীবনটা কতই না মধুর…

বগাকাইন/২০১০

6 Responses

  1. পড়াটা শেষ করতেই মনে হলো, আরো কিছু যেনো বাকি……. 🩵so adventurous 💙

  2. পুরোটা সময় নিয়ে পড়লাম।
    আপনি বরাবর ই আমার কাছে ট্রেকার হিরো💙
    আপনার সাথে একটা পাহাড় ট্রাকিং এ যাওয়া আমার ড্রিম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!