প্যান্ডোরা

আমরা এখন যেই সমাজে বাস করি সেখানে কোন মানুষের ইন্ডিভিজুয়ালিটির কোন দাম নেই। আমি বিশ্বাস করি প্রতিটা মানুষ তার নিজস্ব ইন্ডিভিজুয়ালিটি বা স্বকীয়তা নিয়ে জন্মায়। এই জিনিসটা শিখার বা চর্চার মাধ্যমে ডেভেলাপ করা যায় না। কিন্তু আমাদের এই স্বকীয়তা বেশীরভাগ বিকশিত হওয়ার সুযোগই পায় না। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে আমরা তথাকথিত সামাজিক জীব। আমরা একটা সমাজে জন্মাই, পরিবারে বেড়ে উঠি. আর এটাই আমাদের স্বকীয়তা বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা। কারন আমাদের এই পরিবার, সমাজ, এই স্ট্যাব্লিশমেন্ট যাদের মাঝে আমরা জন্মাই আর বেড়ে উঠি তারা স্বকীয়তা পছন্দ করে না; বিশেষ করে শিশুদের।

অনেকদিন আগে শীর্ষেন্দুর কোন একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। উপন্যাসের নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। সেখানে একটা শ্লোকের উল্লেখ ছিল। যার মোটামুটি অর্থ হল পুরুষ বীর্যের মাধ্যমে তারই একটা অংশের পুনরায় জন্ম দেয়। এই বংশানুক্রমিক প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে সে প্রকৃতিতে তার লেগেসি প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে সে অমরত্ব লাভ করে- এটলিস্ট এমনটা সে ভাবে বা ভাবতে পছন্দ করে। তো আমাদের স্বকীয়তাকে দাবিয়ে রাখার এই চক্রান্ত শুরু হয় পরিবার থাকে। আমাদের বাবা-মা মনে করে সন্তান হিসেবে আমরা তাদের সম্পত্তি।

বাবা মা তার সন্তাদের লালন পালন করেন এটা ভেবেই যে তারা তাদের জীবদ্দশায় যা যা করে যেতে পারেন নি সেটা তারা তাদের সন্তানদের মাধ্যমে পুরো করবেন। তাদের শৈশব, কৈশোর বা বয়সকালের যেই স্বপ্ন গুলো , চাওয়াগুলো তারা পূরণ করতে পারেনি সেগুলোয় তার সন্তানদের মাধ্যমে পূরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যান। জ্ঞান হবার পর থেকেই তাই প্রতিটি সন্তান তার নিজস্ব স্বকীয়তার অস্তিত্ব বুঝে উঠার আগেই তার বাবা-মা’র স্বপ্ন ও প্রত্যাশার বৃত্তে বন্দী হয়ে যায়।আর তাই প্রকৃতি চাইলেও আমরা আর নিজের মত হতে পারি না। এমনভাবে আমাদের ব্রেইনওয়াশ করা হয় যে আমরা অন্য কেউ হয়ে যাই। আমরা নিজেদের নিজস্বতা, স্বকীয়তা হারিয়ে অন্যের লেখা স্ক্রিপ্টে প্রাণপন শুধু অভিনয় করে যাই। আর তাই অন্যের জীবনের ছায়া হয়ে আমরা কেউ খুশি থাকি না।

আমি যখন খুব ছোট ছিলাম আব্বুকে দেখতাম আমার বোনকে পড়াতে বসত। হাতের লেখা এমন কেন, জোড়ে জোড়ে পড় যেন আমার কানে আসে, এটা এভাবে, ওটা ওভাবে, সেই ছোটবেলা থেকেই আমি জানতাম আমার বোন ডাক্তার হবে। তাকে ডাক্তার হতেই হবে কারণ আমার আব্বু চায়। আব্বুর এই স্বপ্ন বা চাওয়ার জন্য বেচারী তার পুরো জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে। সারাদিন ও শুধু পড়ত আর পড়ত। ওর নিজস্ব কোন লাইফ ছিল না। গল্পের বই পড়ত না, গান শুনত না, মুভি দেখত না- শুধু পড়ত। এখনো ও শুধু পড়েই। এখনো ওর কোন নিজস্ব লাইফ নেই। ও এমন এক লুপহোলে আঁটকে গেছে যার থেকে ওর আর কোন নিস্তার নেই।

বোনের এই দূরাবস্থা দেখেই বোধ হয় আমি সেই ছোটবেলা থেকেই বিদ্রোহ করেছিলাম। আব্বুর মেথডে আমি পড়তে অস্বীকার করতাম। আমি দিন দিন অবাধ্য হয়ে উঠছিলাম দেখে ছোট বয়সেই আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। এখনো আমার মনে আছে আমি যখন কথা শুনতাম না সে তখন আমাকে ফেনীর ছাগলনাইয়ার কোন এক মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেবার ভয় দেখাত। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত তার মনে দয়া হওয়ায় বুঝি ফেনীর বদলে রেসিডেন্সিয়ালে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তার শত চেষ্টার পরেও আমি আসলে ঠিক হয় নি। আমি আমার মতই আছি।

এই কথাটা বললাম কারণ আমার বোন নিজেও এখন সন্তানের মা হয়েছে। তার ছেলে লেখাপড়া শেখার মত বড়ও হয়েছে। ছোট ছোট কবিতা তার মুখে শুনতে ভালই লাগে। অবাক হয়ে দেখলাম আমার বোন নিজেও তার ছেলেকে পড়ানোর সময় কি রকম কর্কশ হয়ে যায়। উ, ঊ ( দীর্ঘ উ) উচ্চারণ ঠিকঠাকভাবে করতে না পারায় ছেলের উপর তার কি রাগ। লিখার সময় তো আরেক বিপত্তি। ছেলে তো বাউয়া, বাম হাতে পেন্সিল ধরে। এটাও তার পছন্দ হয় না। জোর করে তাকে ডান হাতে লিখানো চেষ্টা করে। কি অবস্থা! বাম হাতে লিখা যে একটা স্বাভাবিক ব্যাপার, আর তাকে যা খুশি তাই করতে দেয়া দরকার আমার বোনকে এটা বুঝাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। চার বছরের সদ্য বুলি ফোটা এই বাচ্চার জন্যেও তার বাবা-মা নিশ্চয় তাদের মত করে কোন ভবিষ্যতের ছক এঁকে রেখেছে। ও তো অবুঝ, ও কি বুঝবে ওর জন্য কোন টা ভাল হবে আর কোন টা খারাপ। বাবা-মা’ই সিদ্ধান্ত নেবে ছেলে ডাক্তার হবে না ইঞ্জিনিয়ার।

এই চক্র পরিবার থেকে শুরু হয়, এরপর একে একে স্কুল, কলেজ ইউনিভার্সিটি, এরপর জীবনে আসে নানা রকম ‘ইজম’। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক। শিক্ষক, ধর্মীয় গুরু, তাত্ত্বিক নেতা সবাই যার যার আইডিওলজি আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, সেই অনুযায়ী চালানোর চেষ্টা করে। এই করা যাবে না, এই রকম করতে হবে, আমরা যা চাচ্ছি এমন টা না হলে তুমি ব্রাত্য, তুমি চ্যুত।

আমাদের পুরো জীবনকালে এই শুভাকাঙ্ক্ষী বা জীবনের চালকদের মন্ত্রনা শুনতে হয়। ভাল লাগুক আর খারাপ লাগুক তাদের মত চলতে হয়। কখনও কোলাহল মুক্ত কোন নির্জন জায়গায় চোখ বন্ধ করে নিজের জীবনটা নিয়ে একটু ভেবে দেখবেন। একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন আপনার জীবন সম্পর্কে নিজস্ব কোন ধারনা নেই, নিজের কোন চাওয়া ও নেই- সেখানে শুধু একগাদা মানুষের কন্ঠস্বর। কেউ এটা চাচ্ছে, কেউ ওটা চাচ্ছে, তাদের চাওয়া অনুযায়ী আপনি জাস্ট চলছেন। অনেক চেষ্টা করেও আপনি যা শুনতে পাবেন না সেটা হল আপনার নিজের মনের কন্ঠস্বর। যা আপনার জ্ঞান হওয়ার সাথে সাথেই বাক্সে বন্দি করে ফেলা হয়েছে। রুপকথায় এই বাক্সকেই ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ বলে। এটা খুলে গেলেই বিপর্যয়!

ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় মুরুব্বীদের কথা মত চলতে, হুজুর যা বলে সেই মত ধর্ম পালন করতে, টিচার যা বলেন সেটাই শিখতে। আমার নিজের কি মনে হচ্ছে সেটা কেউ শুনতে বলে না। কেউই বলে না তুমি পড়, তুমি জানো, এনালাইসিস কর, নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে বিচার কর সব কিছু। এরপর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নাও। কিছু না বুঝেই অন্ধের মত কাউকে ফলো করে যাওয়া জীবন না। এটা জীবনের অপমান। তাই নিজের মত হও।

আমি বিশ্বাস করি প্রকৃতিতে আমাদের প্রত্যেককে সুনির্দিষ্ট কিছু আলাদা বৈশিষ্ট, আলাদা অজেক্টিভ সার্ভ করার জন্য পাঠানো হয়েছে। ভেড়ার পালের মত পিছু পিছু হেঁটে যাবার জন্য আমরা পৃথিবীতে আসি নাই। আমি একটা জিনিস বুঝে গেছি, আমি যদি আমার নিজের মত হতে না পারি তাহলে আমাকে, সংশয়, হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। পৃথিবীতে তারাই প্রকৃত সুখী যারা নিজের মত নিজের টার্মসে জীবন কাটাতে পারে। তাদের কখনোই অন্যের আইডিয়া, এই সমাজ এই স্ট্যাব্লিশমেন্টের ম্যানিপুলেশন চালিত করতে পারে না।

পৃথিবীতে হাজার হাজার ইজম আছে, আইডিওলজি আছে। এগুলো যতই বিজ্ঞ লোকের ভাবনা হোক, এর কোনটাই আমি ফলো করব না। কারণ এর কোনটাই আমার নিজস্ব না। আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে ঐ ভাবনাটা জানা, যেটা বোধ হওয়ার আগেই দাবিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেটাই প্রকৃতি আমার জন্য ঠিক করে দিয়েছে। যতই আমাদের উপর রোলার কোস্টার চালানো হোক, ডিপ ইনসাইড আমাদের মনে এই স্পার্ক টা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। খুবই ক্ষীণ স্বরে সেটা আমাদের চেতনাকে ডাকতে থাকে। কিন্তু আমরা সেই ডাক শুনতে পাই না। কারণ অলরেডি আমাদের চারপাশে লাউডস্পিকারে অন্য বাজনা চালিয়ে দেয়া হয়। এই কোলাহল থাকাতে না পারলে, মাথা থেকে অন্যের কন্ঠস্বর পুরোপুরি দূর করতে না পারলে আমরা কখনওই নিজের মনের সেই ডাক শুনতে পারি না।

আমাদের তাই এমন কিছু করতে হয় যেন সব সোরগোল থামিয়ে দিতে পারি। এই এমন কিছু একেকজনের জন্য একক রকম। এটারও সুনির্দিষ্ট কোন কিছু কখনো হয় না। এটাও সবাইকে যার যার মত করে খুঁজে নিতে হয়। প্রথম যেবার আমি পাহাড়ে গেলাম, সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম আমার বক্সের চাবি এই পাহাড়েই লুকিয়ে আছে। এই কারণেই আমি সুযোগ পেলেই পাহাড়ে চলে যাই । কারণ আমার জন্য দরকারী সেই নৈঃশব্দ, সেই শান্তি আর প্রশান্তি আমি পাহাড়েই খুঁজে পাই। এতদিন পর আমি বলতে পারি প্রতিনিয়ত আমি আমার সেই প্যান্ডোরার বাক্সের কাছাকাছি চলে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে আমার চারপাশের কোলাহল সব থেমে যাচ্ছে। সেই কাঙ্খিত ট্রান্স স্টেট এখন আর কল্পনা নয়। অচিরেই হয়ত আমি আমার নিজের সাথে মুখোমুখি হব। যেন যাব আমি আসলেই ঠিক কি চাই।

আবার মাঝে মাঝে একটু আশংকাও জাগে। এটা কোন ইলিউশন নয় তো। আমি কোন ইনশেপশনের মধ্যে নেই তো। কোন ঘুম ভাঙলে যদি দেখি সম্পূর্ন অন্যকোন লুপে চলে গেছি?

2 Responses

  1. সত্যি চমৎকার লেখা। স্বাধীনতায় বিশ্বাসী বলে এক জায়গায় থাকতে পারিনি কখনো। আপনার লেখা পড়ে নিজেকে উপলব্ধি করছি আরো বেশি। পাহারের যাওয়ার কি যে স্বাদ, যে না গেছে সে বুঝবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!